ইয়ালা ডায়েরী পর্ব ৭ (শেষ পর্ব)
১৩ নভেম্বর ২০২৪ – দিন ১১
খুব স্বাভাবিক ভাবে সকালের সব কাজ আর নাস্তা শেষ করে আমরা আজকের ট্রেকের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। আজকের রাস্তা প্রায় ১৫ কিলোমিটার, বিকাল হয়ে যাবে, সন্ধাও হতে পারে। মাহি সবাইকে আজকের নির্দেশনা দিয়ে দিল, আজ সবাই একসাথেই হাঁটবো, কেউ দৃষ্টি সীমার বাইরে যাবে না। বিভিন্ন জায়গায়, ছোট ছোট করে আড্ডা দিয়ে, ছবি তুলে আর বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে হাঁটবো। আমাদের দুপরের খাবার হবে লামা হোটেলে। ল্যাংটাং থেকে লামা হোটেল পর্যন্ত সম্পূর্ণ রাস্তা জুড়েই অনেক পাহাড় দেখা যায় আর একটু পর পর ছোট ছোট গ্রাম। আমরা সবাই একসাথে হাঁটছিলাম, একটু পর পর মাহি ভালো লোকেশন পেলেই সবাইকে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে দিচ্ছিলো।

লামা হোটেলে দুপুরে খাবারের বিরতি
আজকে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, কোনমতে খোঁড়াতে খোঁড়াতে লামা হোটেলে পৌছাই। পা কিছুটা ফুলে গিয়েছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, কিছুটা ফিটনেস নিয়ে কাজ না করে আর পাহাড়ে আসা যাবে না। একে তো শরীর ভারী, এরসাথে যুক্ত হয়েছে দুর্বলতা! একদম যা তা অবস্থা… মাহি আমার পায়ে রোল-অন লাগিয়ে দিল আর ম্যাসাজ করে দিল।

ব্যাম্বুর কিছু আগের ব্রিজ
ইয়ালা বেস ক্যাম্প থেকে ঘুরে আসা আচার, বালাচাও বের করা হল লাঞ্চের টেবিলে, সবাই এগুলো খেতে খেতে বেস ক্যাম্পের স্মৃতি মনে করতে থাকলো। খাবার শেষ করে আমরা চলতে শুরু করলাম। আমার কম বেশী কষ্টই হচ্ছিল। তারপরও চলতে হচ্ছিল, পথ যে শেষ করতেই হবে। আজকে দুপুরের পর থেকে অর্ণব আমার কাছে কাছেই ছিল, ও বুঝতে পারছিল যে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, যে কোনো সময় আমাকে চ্যাং দোলা করে নিয়ে যেতে হতে পারে! একটা ব্রিজটা পার হয়ে কিছু দূর যেতেই সন্ধা হয়ে আসছিলো। আমার গতি কমতে কমতে শূন্যের কোটায়! আমার পেছনে মাহি, কিছু সামনে অর্ণব। আমি বার বার অর্ণবকে বলছি চলে যা। কে শোনে কার কথা? একদম টুক টুক করে অনেক কষ্টে আসলাম ব্যম্বুতে। তখন আমার এক কদম দেওয়াতেই ভয়ংকর কষ্ট হচ্ছে! ডাইনিং এর ভেতর দিয়ে পেছন গেট দিয়ে রুমে গেলাম কিছু সিঁড়ি কমানোর জন্য। কিছুক্ষন শান্ত হয়ে বসলাম। আমাদের সবাই ডাইনিং এ হৈ চৈ করছে। এখানে একটা মজার অভিজ্ঞতা হয়েছে। একটা টয়লেট এর দেয়াল থেকে একটা ছোট পাইপের সাহায্যে সারাক্ষণ পানি পরছে, কোন কল নাই! একটা বালতি আছে, সেটা ভরে উপচে পরছে পানি। এক এক জন, ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে, না ভিজে টয়লেটের এর কাজ সেরেছে। কেউ বালতি দিয়ে পানি ঢেকে বসেছে, কেউ বালতির পানি ফেলে, সেই বালতি আবার ভরতে ভরেতেই কাজ সেরে বেড় হয়েছে, কেউ একদম দরজার কাছে বসে কোনমতে পানি থকে বেঁচে কাজ সেরেছে! সে এক বিরাট সারভাইভ্যাল অভিজ্ঞতা। মজার বিষয় হল, আমরা সহ অন্যান্য বিদেশীদের কারোই কোন বিরক্তই ছিল না এই ব্যপারে…জীবন যেখানে যেমন, তা মেনে নিয়ে চলত পারাই বৈরি পরিবেশে টিকে থাকার মূলমন্ত্র!
রাতের খাবারের সময় তৌকির একজনের সাথে বিরক্ত হোল কারন, সে একটা খাবার শেষ না করেই আরেকটা খাবার অর্ডার করতে চাচ্ছে। তৌকির সুন্দরভাবে ও অত্যান্ত ধৈর্য সহকারে, একটা খাবার শেষ হবার পর আরেকটা অর্ডার করার পরামর্শ দিল। ফলশ্রুতিতে, সে ব্যক্তি বুঝতে পাড়ল যে একটা খাবার শেষ করতেই হিমশিম খাচ্ছে…আরেকটা খাবার নিলে অপচয় হতো।
১৪ নভেম্বর ২০২৪ – দিন ১২
সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি বুঝতে পারলাম, আমরা যাবার দিন যে হোটেলে প্রথম দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম, এটা সেই হোটেল! গতকাল আমার এখানে পৌছাতে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল আর আমি এতই বিধ্বস্ত ছিলাম যে জায়গা টা খেয়াল করনি।
নাস্তার টেবিলে যথারীতি অনেক মজা হোল। আজকে কে যেন এ্যাপেল পাই নিয়েছিল, একটু খেয়ে দেখি অনেক মজা, এর পর আরও কয়েকটা এ্যাপেল পাই নেওয়া হোল আর সবাই কাড়াকাড়ি করে শেষ করলো। আজ সকাল ৮ টায় আমরা বাম্বু থেকে ট্রেকিং শুরু করি। আজকেই আমাদের ট্রেকিং এর শেষ দিন, কিভাবে দিনগুলো শেষ হয়ে গেল! আমরা মোটামুটি ট্রেক শুরু করেই বুঝলাম ল্যান্ড স্লাইড হয়েছিল। সম্পূর্ণ ট্রেক একদম ধুলায় ভরে গেছে!
ভিডিও: ল্যান্ড স্লাইডের অবস্থা

সাইব্রুবেশি পৌঁছানোর আগ মুহূর্ত
পাহাড়ি একালায় আজকে শেষ লাঞ্চ, সবাই আবার সবার পছন্দমত খাবার নিল। কারো কারো ব্যাগ এখানে রেখে গিয়েছিল, তারা ব্যাগ বুঝে নিল। এখান থেকেই আমাদের পোর্টার মিংমা আর লাল এর সাথে আমাদের ব্যাগ বহন করার চুক্তি শেষ হোল। সবার কাছ থেকে কিছু টিপস তুলে একসাথে করে ওনাদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হোল। পোর্টার দের সাথে কথা হয়েছিল ৪০ হাজার রুপির, কিন্তু ওদের উপর অনেক বেশী চাপ ছিল ২-৩ জনের জিনিস যোগ হওয়াতে, মিশন হিমালয়ার সবাই আর আমি মিলে ৪৫০০ রুপি একসাথে করা হোল, সব সহ ওদের ৫০ হাজার রুপি দেওয়া হোল। দেখে মনে হোল ওরা দুজন খুশি হয়েছে। এখন গন্তব্য কাঠমান্ডু। সময়ের সাথে না মিল থাকায় আমরা এবারও বাস পেলাম না, সেই জীপ গাড়িতেই রওনা করলাম। সবাই ক্লান্ত কিন্তু ফুরফুরে মেজাজে আছে। ফিরে যাচ্ছি কাঙ্ক্ষিত ট্রেক শেষ করে… পথে গাড়ির চারজিং পয়েন্টে বেশ কিছুক্ষণের বিরতি, এই সময়ে আমরা বিস্কুট, চিপস আর চা মিলে অনেক অনেক সময় ধরে খেলাম। আবার যাত্রা শুরু। গানের তালে তালে বিরাট হৈ হুল্লোড় হচ্ছে গাড়িতে, জানালা দিয়ে বাইরে সুন্দর ঝকঝকে বড় একটা চাঁদ দেখা যাচ্ছে।

ট্র্যাকের শেষ দিকের চড়াই
খুব অবাক হলাম, কিভাবে এত দ্রুত এই কষ্টসাধ্য চড়াই উৎরাই এর অভিযান শেষ করে ফিরে যাচ্ছি…কিভাবে এতগুলো দিন চোখের পলকে, ডাল ভাতের প্যাকেজে আর ব্যাগ গোছাতে গোছাতেই শেষ হয়ে গেল…আর অনেক কিছু ভাবতে চাচ্ছিলাম কিন্তু তাহমিদের বেতাল হাততালি বেশিক্ষণ আর নীরবতা উপভোগ করতে দিল না, ও বার বার বলছে, আমি সারারাত গান গাইতে পারবো আর হাততালি দিতে পারবো। জানালার বাইরের ঝকঝকে চাঁদ উকি দিয়ে দিয়ে অনেক কিছু মনে করিয়ে দেবার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে… আমি ধুম ধারাক্কা গানের তালে মনযোগ দিলাম আর সময় গুনতে থাকলাম, কথন কাঠমান্ডু পৌছাবো আর আল মদিনা তে খাসির তরকারী দিয়ে ভাত খাবো। আমাদের হোটেল থেকে একটু দূরে রাস্তায় আমাদের নামিয়ে দেওয়া হোল। আমি সকাল হবার অপেক্ষা করছি কারণ শপিং শুরু করবো…


ক্লাইম্ব শেষে সবাই খুশি
সকাল সকাল আমরা দরবার স্কয়ার গেলাম সবাই। মাহি বলল, কিছুটা স্থানীয়দের মত করে সবার সাথে মিশে ঢুকে যেতে। আমরা তাই করলাম। যদিও এখানে সবাইকে ফুল দিয়ে একজন গুবলেট করার চেষ্টা করেছে… আমরা সবাই অনেক ছবি তুললাম, মিষ্টি খেলাম, ঘোল খেলাম, আর অনেক মজা করলাম। ফিরে এসে মদনের দোকানে গেলাম। আমাদের স্লিপিং ব্যাগ গুলো জমা দেওয়া হোল। মদনের দোকান থেকে সবাই যার যার প্রয়োজন মতো উপহার সামগ্রী কিনে নিল। দোকানে বসে আছি, একজনকে দেখলাম পরিচিত মনে হোল, তমাল আর সাথে জাহিদ নুর। ওদের সাথে কথা হোল। এবার নেপালে অনেকের সাথে দেখা হয়েছে। মাহি আর তৌকিরের ফেরার টিকেট কেনা ছিল না, ওরা হিমালয়ান এয়ার এর ফ্লাইট বুক করলো, যা আগামীকাল আমাদের বিমানের ফ্লাইট থেকে থেকে ১ ঘণ্টা পরে।

দরবার স্কয়ার
রাতের খাবারে আমরা সাকুরা বুটিক হোটেলের মালিক আকাশ কে দাওয়াত দিলাম, উনি খুব সম্মানের সাথে আমাদের দাওয়াত গ্রহণ করলেন। দুপুরের পর এ্যাসট্রেক এ ক্লাইম্ব করার পরিকল্পনা হোল। সবাই যে যার মত করে কেনাকাটা শেষ করছে। মোটামুটি সবাই বাসার সবার জন্য শাল নিল। আমি আর অর্ণব মাউন্টেন হার্ডওয়্যার থেকে কয়েকটা পানির বোতল আর ১২ টা ক্যারাবিনার নিলাম উপহার দেবার জন্য। তিব্বত বুক স্টোরে গেলাম, আমার, তৌকির আর অর্ণবের পছন্দের তিনটা বই Art of letting go, A Day to Die for, You are here, সাথে বুকমার্ক, ২০২৫ এর ক্যলেন্ডার নিলাম। ১৪ টা ৮ হাজার মিটার পর্বতের ফ্রিজ স্টিকার নিলাম।
ছোট ছোট করে অনেক স্মৃতি জমা হচ্ছে আজ এই শেষ দিনে। সন্ধ্যার শেষ ভাগে ইনতিয়াজের সাথে দেখা হোল আমাদের হোটেলে, অনেক অনেক আড্ডা হোল। আমরা সবাই এক খাটে চাপাচাপি করে বসেই আড্ডা দিয়েছি। ভাগ্যিস, হোটেল রুমের খাট টা কথা বলতে পারে না, তানাহলে বলতো আমাকে দুজনের জন্য বানানো হয়েছে, এত জনের জন্য না…!

রাতের জমপেশ আড্ডা ইনতিয়াজের সাথে
যেকোনো জায়গায় গেলে সবচেয়ে বেশী মজা আর কেনাকাটা হয় আগের রাতে। আমাদের ক্ষেত্রেও এর বিপরীত হোল না। অনেক রাত পর্যন্ত সবাই টুকিটাকি কেনাকাটা, আইসক্রিম খাওয়া সাথে বাঁধভাঙ্গা আনন্দ… আমি যতটুকু সম্ভব আতাফল খেয়ে নিচ্ছি। অনেক গিফট কিনলাম, আমার সবসময় কেনার সময় দুনিয়ার সবার কথা মনে চলে আসে… মাত্র ৩৫ টা ব্রেসলেট আর ২৭ জোড়া, কানের দুল কিনলাম। এছাড়া বেশ কিছু চাবির রিং, প্রেয়ার ফ্ল্যাগ, ব্যাগ, সাবান, বাদাম, আরও অনেক কিছু। আমি সাধারণত কেনার পর জিনিসগুলো কখনোই বহন করি না, তাই কেনার সময় ওজনের খেয়াল করি না, এটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই যখন আমি একা কোথাও যাই…অনেক কষ্ট! কেনাকাটার এক সময়, মদন আমার জন্মদিন জানতে চাইল, সে তারিখ অনুযায়ী ইন্টারনেট থেকে দেখে একটা আংটি বেড় করে দিল, মুনস্টোন, এটা নাকি আমার বার্থস্টোন। যেহেতু অনেক শখ করে মদন আমাকে দিল, তাই ওর সামনেই পরে ফেললাম, আর মনে মনে একবার ভেবে নিলাম যে আমি এটা শুধুই হাত সাজানোর জন্য পরেছি, কোনো বিশ্বাস থেকে নয়, কারণ এটা সম্পূর্ণ শিরক! ফারজানা আমাকে একটা মালা পছন্দ করে দিতে বলল, আমি হলুদ রঙের একটা পছন্দ করে দিলাম, আমি তখন জানতাম না যে ও এটা আমার জন্যই নিচ্ছে!

এত খুশি, কোথায় রাখি?
অর্ণবকে বললাম, মেরা পিক সামিট করা উপলক্ষে মাকে গিফট কিনে দিতে, ও অনেক গাইগুই করতে করতে আমকে ধুতি ডিজাইনের প্যান্ট কিনে দিল। দোকানের ভদ্রলোক অনেক অবাক হোল আমি ওর মা শুনে… শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাবার কথা মনে হোল, ওখানে এক জীপের চালক জানোতে চেয়েছিল, আমরা কি হই? আমি ওনাকে আন্দাজ করতে বললে, উনি বলেছিলেন আমরা কাপল। পরে মা ছেলে জানোতে পেরে অনেক লজ্জা পেয়েছিল…আমার অনেক ভাল লাগে যখন কেউ আমাদের মা ছেলে জানোতে পেরে অবাক হয়। অর্ণবের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য ১৫ বছর, আমাদের দেশে এই বয়েসে মা হওয়াটা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না…

সাকুরা হোটেলের মালিক আকাশকে সুভিনিওর হিসাবে আমাদের টিশার্ট দেওয়া হচ্ছে
সাকুরা হোটেলের মালিক সহ আমরা অনেক হাসি আনন্দ করতে করতে রাতের খাবার শেষ করলাম। আকাশকে সুভিনিওর হিসাবে আমাদের টিশার্ট দেওয়া হোল। খুব শান্ত এবং ভদ্র মানুষ আকাশ। কারো সাথে পরিচয় হলে আমি সেই মানুষটাকে পর্যবেক্ষণ করতে পছন্দ করি। ওর কথা শুনে মনে হয়েছে শিক্ষিত আর যথেষ্ট ফ্যাশন সচেতন। আমাদের পাশের টেবিলে একটা পরিবার বেসেছিল, সেখানে দুজন বাচ্চা অনেক চেঁচামেচি করছিল। ওদের আওয়াজ আর একই কথা বারবার বলাটা একটু বিরক্তকরই ছিল, ওদের বাবা মার দিকে আকাশ যেভাবে তাকিয়ে ছিল, তাতে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, আকাশ একটু শান্ত পরিবেশ পছন্দ করে আর ঐ পরিবারের দিকে তাকিয়ে ও তাদের পারিবারিক ভদ্রতার অবস্থান মাপার চেষ্টা করছিল…লোকাল হলে হয়ত ও কিছু বলত, কিন্তু ওরা বাংলাদেশী হওয়ায় আমি মনে মনে লজ্জা পেলাম। যদিও এসবের কিছু আকাশ খেয়াল করনি। ফেরার সময় আমি টাইগার বিস্কুটের প্যাকেট নিলাম ১০ টা। এই বিস্কুট আমরা কাঠমান্ডু ফেরার পথে গাড়ির চারজিং স্টেশনে খেয়েছিলাম, আর মনে মনে ভেবেছিলাম ফেরার পথে কয়েকটা নিয়ে যাবো। এটা ঠিক হাইড এন্ড সিক বিস্কুটের মত চকলেট চিপস দেওয়া। হোটেলে ফিরে ব্যাগ গোছানোর সময় সবাইকে আবার ভালকরে বলে দেওয়া হোল যে সব ধরনের ইলেক্ট্রিক্যাল জিনিস হাত ব্যাগে থাকবে, মোবাইল, চারজার, ব্যটারী, পাওয়ার ব্যাংক এসব কিছুই চেক ইন ব্যাগে যাবে না। কে জানতো তাহমিদ আবার সবার ধৈর্য পরীক্ষা নিবে…!
আমি যে কাপড় পরে ফিরবো, সেই কাপড় পরেই ঘুমাতে গেলাম, বাকি সব গুছিয়ে ফেললাম। আমাদের ডাফেল ব্যাগ গুলো অনেক ওজন হয়েছে।
১৬ নভেম্বর ২০২৪, দিন ১৪ (শেষ দিন)
আমাদের ফ্লাইট ১২-৩৫ এ, নাস্তা আর চা খাওয়া শেষ করে আমরা এয়ারপোর্টের উদেশ্যে বের হবো, এমন সময় আমি আবার একটু দোকান গুলো থেকে হেঁটে আসলাম, কারণ কাল আমর একটা বাটিকের হুডি শার্ট পছন্দ হয়েছিল, ১২০০ রুপি, আমি ১০০০ বলেছিলাম, দেয়নি, আমিও বিরক্ত হয়ে নেই নি। আজকে আফসোস করছি…পেলাম না, আফসোস রয়েই গেল, পরবর্তীবার আসলে এই বাটিকের হুডি শার্টই প্রথমে কিনব, মাঝে মাঝে আমরা পছন্দের অগ্রাধিকার বুঝতে দেরী করে ফেলি…!

আমরা এয়ারপোর্টের পথে…
আমি, সাদিক, তাহমিদ, ফারজানা, অর্ণব, নুড়ি, কামরুল, আমরা ৭ জন রওনা করলাম, মাহি আর তৌকির ১ ঘণ্টা পরে আসবে। সাইফ আর ইমন গকাল রাতেই আমাদের কাছে থেকে বিদায় নিয়েছিল, ওরা পোখরা গেছে। ২ দিন ঘুরে পরে ঢাকা ফিরবে। সাইফকে নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, কারণ ও যদি আবার কিছু নিয়ে প্যানিক করে অথবা ফিট হতে নেয়, কিভাবে কি হবে? ইমন কি করবে তখন?
এয়ারপোর্টে এসেই এক ঝামেলার সম্মুখীন হলাম, ব্যাগের ওজন নিয়ে। ওরা একটা বাগ ২০ কেজির উপর হলে নিবে না। এমনকি এক PNR এ অনেকজন হলেও নিবে না। আমাদের ব্যাগগুলো সব ২৫, ২৬ আর ৩২ কেজি হোল। আমরা মানুষ ৭ জন। সবার পিঠের ব্যাগ ভালো ওজন হয়েছে। এখন আমাদের তিনটা ব্যগ থকে ওজন কমিয়ে ব্যাগ ৪ টা ২০ কেজির ব্যাগ বানাতে হবে। যেহেতু অনেকের জন্যই এটা প্রথম বিদেশ ভ্রমণ, অনেকেই কিছুটা ঘাবড়ে গেল, আর সবাই কোন না কোন ভাবে এই পরিস্থিতিতে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছিল! অনেক সময়ই এয়ারপোর্টে ওজন কমানো, জিনিস রেখে দেয়া, এগুলো নিয়মিত ব্যপার। মাথা ঠাণ্ডা রেখে অর্ণব ডাফেল ব্যাগ থেকে আরও দুইটা ব্যাগ বের করলো। সবাই কোনো না কোন ভাবে হাত লাগাচ্ছিল কাজে, শুধু একজন কোনো কাজ না করে শুধু কথার পর কথা বলে যাচ্ছে আর কাজের মাঝখানে অর্ণবকে বার বার ডেকেই যাচ্ছে…কে হতে পারে? এই প্রথম অর্ণব বিরক্ত হয়ে বলল, ভাইয়া, আমি তো কাজ করছি, কাজ শেষ হলে কথা বলো! আর একজন ছিল একদম এসব থেকে নির্লিপ্ত, মোবাইল নিয়ে দূরে বসা… এইজন কে হতে পারে? আমরা এক কোনার মধ্যে যেয়ে লাইনে থাকা অন্যদের এগিয়ে যাবার সুযোগ করে দিলাম।

আমরা দেশে পৌঁছে গেছি
যাইহোক, কোনোভাবে উপস্থিত বুদ্ধি ব্যবহার করে ব্যাগের পর্ব শেষ হোল। সবাই একসাথে লাইনে দাঁড়িয়ে বোর্ডিং পাশ নিলাম। সাদিকের টিকেটের সাথে তাহমিদের ব্যাগ চেক ইন করা হোল…যা ঝামেলা হবার এখানেই হোল…। আমরা সব শেষ করে প্লেনে উঠার জন্য অপেক্ষা করছি, এতক্ষনে হয়তো মাহি আর তৌকির এয়ারপোর্টে চলে আসছে। আমরা প্লেনে উঠার লাইনে, এমন সময়, স্পিকারে তিনটা নাম ডাকছে আর ব্যাগেজ এ দেখা করতে বলেছে, এর মধ্যে একজন সাদিক আহমেদ চৌধুরী। সাদিক যেহেতু তাহমিদের ব্যাগ চেক ইন করিয়েছে, তাই তাহমিদ সহ গেল। এর মধ্যে আমরা প্লেনে নিজেদের সিটে বসে গেছি, সেই তিনজনের জন্য প্লেন অপেক্ষা করছে। বেশ কিছু সময় পর ওরা আসলো। সাদিক অনেক স্বাভাবিক ভাবে বলল, তাহমিদের ব্যাগে পাওয়ার ব্যাংক ছিল! যা প্লেনে ব্যাগ উঠার আগে চূড়ান্ত চেকে ধরা পরেছে। আমি জানিনা সাদিকের জায়গায় অন্য কেউ হলে কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতো…কিন্তু সাদিক শুধু বলল, ওর বিরক্ত লেগেছে, যেটা কিছুটা আমার কাছে অষ্টম আশ্চর্যের মত মনে হল! এতবার করে বলে দেবার পরও এই ভুল করার অর্থ হতে পারে, ও শুনেই নাই অথবা শুনেও আমলে নেয়নি! এ জাতীয় মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবেই নিজের অজান্তে অন্য মানুষকে ভয়ংকর বিপদে ফেলে দিতে পারে!
সম্পূর্ণ ফ্লাইটে আমরা অনেক ছবি তুললাম, মজা করলাম, আর নিরাপদে ল্যান্ড করলাম। আমাদের জন্য বাহিরে শান্তা আর অভি অপেক্ষা করছিল। সবার সাথে হৈ হুল্লোড় করে, ছবি তুলতে তুলতে মাহি আর তৌকির চলে আসলো। তৌকিরের ভাই ভাবী আসলেন। অনেক বেশীই আনন্দ উদযাপন হোল, এবার বাড়ি ফেরার পালা…

সবাইকে গাদা ফুলের শুভেচ্ছা
শেষ হোল ১৪ দিনব্যপি অভিযান, সাথে শত শত অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরছি… আগামীকাল থেকে সেই আবার সকালে ঘুম থেকে উঠবো, রেডি হবো, নাস্তা করবো…আর যাত্রা শুরু করবো…কিন্তু উঁচুনিচু সেই ট্রেকে না, সমতল রাস্তা দিয়ে গুলশান ২ এ অফিসের উদ্দেশ্যে। এই শত শত অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নিয়মিত অফিস যাবার অবদানই আসলে সবচেয়ে বেশী…
ইয়ালা অভিযানের গল্প এখানেই শেষ হোল।
শীঘ্রই আমার মালদ্বীপ ভ্রমণের গল্প আসছে…

Leave A Comment