ইয়ালা ডায়েরী পর্ব ৬
১১ নভেম্বর ২০২৪ – দিন ৯
সকালে কোনোরকম ব্যস্ততা ছাড়া ৯ টার দিকে উঠলাম। দাঁত ব্রাশ আর ঘর গোছানোর কাজ শেষ করে নাস্তার জন্য বের হলাম। সকালে খাওয়ার জন্য গরম পানি কল থেকেই নিলাম। গতকাল তেঞ্জিং এর সাথে কথা হয়েছিল, কলের পানিই আমরা খাই। এটা জানার পর, গরম পানি নেবার জন্য বারবার রান্নাঘরে যাবার দরকার হয়নি।
প্রতিবার আমি অভিযানের খবর রাখি দেশ থেকে, যখন নেটওয়ার্ক পায়, তখনই অভিযান দল আমাকে জানায়, আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিতাম আমার লিখার মাধ্যমে। এবার প্রথম আমি অভিযান দলের সাথেই ছিলাম ছেলের শখ পূরণ করতে, আর কীভাবে কীভাবে যেন কেঞ্জিং গুম্ফা পর্যন্ত পৌঁছেও যাই! অভিযানে থাকা সবার পরিবারের মানুষের দুশ্চিন্তা আর একটু স্বস্তির কেন্দ্রবিন্দু থাকি আমি! সবাই বারবার ফোন দিয়ে জানতে চান কোনো খবর আছে কিনা? এবার এভারেস্ট বেসক্যাম্প দলের জাহেদ সোবহান ভাই, ওনার বোনেরা যে কতবার আমাকে ফোন দিয়েছে… আপনজনের মায়া আর ভালোবাসার সাথে কিছুর তুলনা হয় না!
হোটেল ইয়ালা পিকের ম্যানেজার, তেঞ্জিং, বয়স ২৬ বছর, ওদের বাড়ি ল্যাংটাং এ, এখানে ব্যবসার জন্য থাকে। এই হোটেলের মালিক আমেরিকা থাকেন, এই জায়গাটা তেঞ্জিং এর পরিবার ভাড়া নিয়েছে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটার নাম, এঞ্জাজিও লামা, তেঞ্জিং এর স্ত্রী।
নাস্তার জন্য বাহিরের বেঞ্চটাতে বসলাম। নাস্তার প্যাকেজ (একটা রুটি, একটা ডিম ভাঁজা আর মাসালা চা) অর্ডার করলাম। লবণ ছাড়া রুটি আর চা টা একদম ভালো লাগলো না, পাতলা পানিতে শুধু গরম মসলার সুগন্ধ, খেতে পারলাম না, মন খারাপ হোল, কারণ এখানে খাবারের দাম বেশি, খাবার নষ্ট করাটা এমনিতেই ঠিক না, তারউপর টাকাটা ঠিকই দিতে হবে! হট চকলেট অর্ডার করলাম, সাথে সাথেই তাহমিদের কথা মনে হোল, সকাল থকে ওকে একবারও দেখি নি, মনে হয় ঘুমাচ্ছে। তেঞ্জিং এর কাছে জানতে চাইলাম, তাহমিদ কে দেখেছে কিনা? ও জানালো, তোমার ফ্রেন্ড দুইটা তিব্বতিয়ান রুটি, দুইটা ডিমের অমলেট আর হট চকলেট দিয়ে নাস্তা করে গেছে…! গতকাল ডিনারের সময় একটা নেপালি দলের সাথে পরিচয় হয়েছিল, ওরা সারগোরি যাবে। সকালে দেখলাম দুইজন একদম সব ব্যাগ নিয়ে প্রস্তুত, আমি জানতে চাইলাম ওরা এত বেশি ওজন নিয়ে কেন সারগোরি যাচ্ছে? জানতে পারলাম ওরা ফিরে যাচ্ছে, কারণ কাল ওরা দুজন ঠান্ডা কে আমলে না নিয়ে পাতলা কাপড় পরে সন্ধ্যার পর হাঁটাহাঁটি করেছে, তাই দুইজনের এত ঠাণ্ডা লেগে গেছে যে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমি বললাম, আমার কাছে মোনাস আছে, একজন জানালো, ওর এতে এ্যালার্জি আছে। ল্যাংটাং যেয়ে ওরা ডাক্তার দেখাবে। মনটা খারাপ হোল ওদের দেখে। এক মুহূর্তের অসতর্কতার জন্য অভিযানটাই বাতিল হয়ে গেল। এজন্যই বলা হয়, don’t be a Gama in the land of Lama…!
গতকালের উৎসব আমেজের একটা উদ্দেশ্য ছিল, আজ একটা পূজা আছে, সুস্বাস্থ্যের জন্য, ধানভান্ডারী পূজা। এই উপলক্ষ্যে, তেঞ্জিং এর মা ল্যাংটাং থেকে এসেছেন। খুব হাসিখুশি স্বভাবের। উনি নিজেই জানতে চাইলেন আমি ওনার ছবি তুলতে চাই কিনা? না করাটা অশোভন, তাই ওনার ছবি তুললাম, উনি গান গাইতে গাইতে নাচ শুরু করলেন, আমাকে ভিডিও করার জন্য বললেন। করলাম ভিডিও, সেটা দেখতেও চাইলেন। সেই ছবি আর ভিডিও তেঞ্জিং এর সাথে শেয়ার করতে হোল! এইসবের মধ্যে এঞ্জাজিও কিছুটা নির্লিপ্ত ধরনের। কাজ করে যাচ্ছে, কোন কিছু নিয়েই ওর মধ্যে কোন আদিখ্যেতা নাই। মেয়েটা অনেক ভালো ইংরেজিও বলে। একটু অবাক হয়েছি, কারণ এখানকার প্রায় সবাই ইংরেজিতে কথা বলে কিন্তু তা শুধু কাজ চালানোর মতো। আমার চা খেতে ইচ্ছা করছে, আমি রান্না ঘরে চাপাতা খোজার চেষ্টা করছিলাম, তেঞ্জিং এসে আমাকে চাপাতার কৌটা দেখিয়ে দিল, আমি চাপাতা জাল দিয়ে, ডানোর মিনিপ্যাক গুরা দুধ দিয়ে পছন্দমতো করে চা বানালাম। কাঠমান্ডুতে লিসা মাহিকে ওদের অভিযানে থেকে যাওয়া সবগুলো গুরা দুধের প্যাকেট দিয়ে গিয়েছিল। ভাগ্য ভালো যে আমি ওগুলো হাতের কাছে রেখেছিলাম।
বাহিরে গিয়ে বঞ্চে বসলাম, তাহমিদ আসলো। ও নাস্তা করে একটু ঘুম দিয়েছিল। ও বরাবরের মতই গান শুনছে। তেঞ্জিং এসে আমাদের সাথে বসলো। তাহমিদ ওকে কয়েকটা গান ইংরেজিতে অনুবাদ করে শোনাচ্ছিল, যা গানের ভাবার্থের সর্বনাশ করে দিল! কিন্তু তেঞ্জিং অনেক মজা পাচ্ছিলো কারণ ওর পছন্দ অনুযায়ী বাংলা গান নির্বাচন করা হচ্ছিল, যেমন, প্রেমের গান, বিরহের গান, আর আঞ্চলিক গান। আমিও অনেক মজা পাচ্ছিলাম… পাশেই গাঞ্ছাম্পো দাঁড়িয়ে আছে আপন মহিমায়, যতই মেঘ থাকুক না কেনো, গাঞ্ছাম্পোর উজ্জ্বলতাকে একটুও ম্লান করতে পারেনি। এই পাহাড়টার দিকে তাকালেই আমার মনে হয়, আমি এত কষ্ট করে এই পাহাড়টার পাশে থাকার জন্যই এসেছি! গল্প করছি, এমন সময় দেখি একজন অনেক বৃদ্ধ নারী টুক টুক করে হেঁটে আসছেন। ওনার মুখের চামড়া অনেক ভারী আর একদম চকলেট এর মতো গাঢ় গায়ের রং। হাতে একটা তসবির মতো, সেটা জপতে জপতে এগিয়ে আসছেন, শরীরে বেশ কিছু গহনা আছে। তাঞ্জিং জানালো ৯৬ বছরের বৃদ্ধা ওর নানি। পৃথিবীতে মায়ের ভালোবাসার আসলেই অমূল্য, যেহেতু পূজা উপলক্ষ্যে তেঞ্জিং এর মা এসেছেন, তাই নানিও চলে এসেছেন, মেয়েকে দেখতে, এসেই কাজে লেগে গেলেন। বাহিরে একটা পিড়িতে বসে কেজি তিনেক আলু ছিলে দিলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে ওনাকে দেখলাম, উনি পছন্দ নাও করতে পারেন, এই ভেবে কোনো ছবি তুললাম না।
পূজার প্রস্তুতি চলছে, তেঞ্জিং এর মা অনেক ব্যস্ত। রান্নাঘর আর ডাইনিং ঘরে দৌড়াদৌড়ি করছে, আমি হাত দিলাম কাজে, বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী সব একসাথে করা হোল। বিভিন্নরকম বাটিতে, বোয়ামে, চাল, দুধ, ধুপ, বিচ্ছিন্ন মশলা, শুকনো ঘাস, পনির দিয়ে বানানো দুটা ইয়াক, পিতলের কেতলির মধ্যে ময়ূরের পাখা দিয়ে বানানো কলমের মত, এর ভেতরে কোন পবিত্র পানি, কয়েক ধরনের বাদ্যযন্ত্র, টুকিটাকি অনেক কিছু। বুঝলাম, মূল উপাদান হোল দুধ আর পনির। দুইজন পূজারি আসলেন, একজন বয়স্ক, আর একজন অপেক্ষাকৃত কম বয়সের। শুরু হোল পূজা, ওনাদের সামনেই লাল কাপড়ে মোড়ানো অনেক পুরাতন পাতায় মন্ত্র লেখা। বয়স্ক পূজারীর অনেক কাশি হচ্ছিল, বারবার ওনাকে চা দেওয়া হচ্ছিল। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম, ছবি তুললাম, ছবি তোলার আগে পূজারি সাহেবের কাছে থেকে অনুমতি নিয়ে নিলাম। দেখলাম এঞ্জাজিও ফ্লোরে কাপড় বিছিয়ে দিচ্ছে, বুঝলাম, পূজা আর পূজারিদের সম্মান করতেই এঞ্জাজিও নিচে বসবে, তাই আমিও ওর সাথে বসে পরলাম। তাহমিদ পাশেই বেঞ্চে বসা, কানে হেডফোন, দুনিয়ার কোনো খবর নাই… আমি ওকে নিচে এসে বসতে বললাম, ও হাতের ইশারায় বলল, ও ওখানেই ঠিক আছে। আচ্ছা, এখনকার বাচ্চারা আশপাশ পরিবেশ দেখেও কিছু করতে শিখে না কেন? মেয়েটা আমাকে সব বর্ণনা দিচ্ছিল যে কোনটা কি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। খুবই অবাক হলাম জেনে, বড় যে পাত্রে দুধ আছে, সেখানে পনির দিয়ে বানানো ইয়াক ডোবানো হবে, যদি পনিরের ইয়াক ভেসে ভেসে অপর প্রান্তে চেয়ারে বসা মানুষের দিকে ফিরে আসে, তাহলে তার সারাবছর সুস্বাস্থ্য থাকবে! সাধারণত বাসার সবাই এক এক করে সেই চেয়ারে বসে, অথবা নিচে বসে পূজার কার্যক্রম সম্পন্ন করে।

তেঞ্জিং ওদের ঐতিহ্যবাহী একটা সাদা শার্ট পরে আসলো। ওর বউ বলল, এটা ওর বিয়ের কাপড় ছিল। আমাকে ফেসবুক থেকে বের করে ছবিও দেখালো। একটা ব্যপার লক্ষ্য করলাম, পূজারী যতটা সময় নিয়ে তেঞ্জিং এর পূজার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলো, তার চেয়ে অনেক কম সময় দিল ওর বউ আর মার সময়। আরোও অনেক ছোট ছোট আনুষ্ঠানিকতা করে দুপুরের পর পূজা শেষ হোল, আমি বাহিরে যেয়ে দেখলাম অনেক মেঘ করেছে, অনেক ঠান্ডা। আজ সকাল থেকেই আবহাওয়া অনেক মেঘাচ্ছন্ন। আমাদের ইয়ালা পিক অভিযানের দলের মনে হয় এতক্ষণে সামিট হয়ে গেছে। ওরা কি আজ ফিরবে কিনা বুঝতে পারছি না। কোনো খবর জানিনা। যদি সামিট করতে বেলা শেষ হয়ে যায়, তাহলে বেস ক্যাম্প ফিরতেই সন্ধা হয়ে যাবে, তাহলে আর আজ ওদের ফেরা সম্ভব হবে না। এখনে এত ঠান্ডা, না জানি ওদের ওখানে কি অবস্থা…সাইফ, ফারজানা কেমন আছে? কি হচ্ছে কিছুই জানিনা…দুপুরের শেষভাগে এসেও আমার কিছু খেতে ইচ্ছা হচ্ছে না, তেঞ্জিং কে বললাম, যেন আমার জন্য ডাল ভাত রেখে দেয়, আমি পরে খাবো। আমি আরেকবার চা বানিয়ে খেলাম নিজের মতো করে। ভাবলাম, এত ঠান্ডা কাছ থেকে দেখার সুযোগ ছাড়া ঠিক হবে না। বের হয়ে, সামনের দিকটায় হাঁটতে গেলাম। যদিও অনেক ঠান্ডা, কিন্তু মেঘের ভেলা দেখতে এতই মনোমুগ্ধকর যে তাকিয়ে থেকেই অনেক সময় পার করে দেওয়া যায়।
হোটেলে ফিরে আসলাম, এখন ভাত খাবো। যেহেতু ডাইনিং এ পূজারীরা এখনো আছেন, ধুপ আর বিভিন্ন পানীয় মিলে কিছুটা তীব্র গন্ধ আছে, তাই আমি রান্নাঘরেই চুলার পাশে খেতে বসলাম। আজ ভাতের সাথে করল্লা ভাজি দেখে মনটাই ভালো হয়ে গেল, করল্লা আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমার আনন্দ দেখে তেঞ্জিং সম্পূর্ণ কড়াই টা আমার সামনে এনে দিল, যেন আমি আরো নিতে পারি। কেঞ্জিং গোম্ফায় বসে করল্লা ভাজি দেখে মনে পরে গেল, মানালীর কথা। দিল্লী থেকে মানালী যাবার পথে সব হোটেলের খাবার অনেক মশলা যুক্ত, প্রতিটা হোটেলেই মনে হয়েছে সবজির রেজালা খাচ্ছি। মানালী যেয়েই শুরু হোল বমি, তাই আমাদের একদিন বেশী থাকতে হয়েছিল। দুই দিন আমি কিছুই খেতে পারিনি, হোটেলকে বললাম আমি রান্নাঘরে যেয়ে আমার মত করে কিছু বানাতে পারবো কিনা? ওদের এমন নিয়ম নাই। আমি ভাল করে বুঝিয়ে দিলাম যে কড়াইতে শুধু অল্প তেল দিবে, পেয়াজ দিবে আর করল্লা দিবে। যা আসলো, তা হোল তেলে ডুবা করল্লা ভাজি, আমি সব তেল ফেললাম, টিস্যু দিয়ে করল্লা গুলো ভালোকরে মুছে, দুই দিন পর ভাত খেয়েছিলাম সেই করল্লা ভাজি দিয়ে…!
ঢিলেঢালা ভাবে বিকাল আর সন্ধ্যার বাকি সময়টা ডাইনিং এ কম্বলে পা জড়িয়েই কাটিয়ে দিলাম। কাজের কাজ করলাম, পছন্দের তালিকা থেকে আরেকটা মুভি দেখে ফেললাম, দা শশাঙ্ক রিডেম্পশন। তাহমিদ আবার আমার বোতল থেকে পানি চাইল, আমি পানি দিলাম, আর ওকে জোড় দিয়ে বললাম, ওর পানির বোতল নিয়ে আসতে। ও খুব বাধ্য বাচ্চাদের মতো পানির বোতল আনতে চলে গেল, বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে আসলো হাতে অনেকগুলো বই খাতা নিয়ে, কিন্তু পানির বোতল নাই! আমি ওকে কিছুই বললাম না, শুধু দেখতে থাকলাম ও কি কি করে? টেবিলে বসলো, বইগুলো ছড়িয়ে দিলো, কানে হেডফোন তো আছেই। গানের তালে টেবিলে ঝুঁকে লিখা শুরু করলো। মনে হচ্ছিল, কখন যে ওর মাথা টেবিলে ঠাস করে ধাক্কা খায়, আর ঝাঁকির চাপে টেবিল ই না ভেঙ্গে যায়, তাই নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে বসলাম। আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ওর কাছে জানতে চাইলাম, তুমি কি করছো? উত্তর পেলাম, IELTS এর পড়ালেখা করছে… আমি খুব শান্তভাবে বললাম, এখানে বসে তোমার পড়ালেখা করার চাইতে নিয়মিত পানি খাওয়াটা জরুরি, তুমি পানির বোতলটা কেন নিয়ে আসলানা? ও আমাকে খুব হাস্যজ্জ্বল ভাবে বলল, ও এক ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে এসেছে…
গতকালের মতই শুধু রসুনের সুপ দিয়েই ডিনার করলাম। কাল দুপুরের মধ্যে ওরা চলে আসবে, এই চিন্তা করেই অনেক ভালো লাগছে…
১২ নভেম্বর ২০২৪ – দিন ১০
আজকের সকালটা অনেক সুন্দর, রৌদ্রোজ্জ্বল। আমি নাস্তা শেষ করে, এঞ্জাজিওর সাথে গল্প করছিলাম। জানতে চাইলাম, ও পড়ালেখা করেছে কিনা? মেয়েটা মাস্টার্স পাশ করে ল্যাংটাং এর একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতো। তেঞ্জিং এর সাথে বিয়ের পর এই হোটেলেই সময় দেয়। এঞ্জাজিও বিয়ের পর থেকে বছরে বেশিরভাগ সময় কেঞ্জিং গুম্ফাতে থাকে। তেঞ্জিং কতটুকু পড়ালেখা করেছে জানতে চাইলে, এঞ্জাজিও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে, উনি সব জানে কিন্তু সার্টিফিকেট নাই! সুদূর কেঞ্জিং গুম্ফাতেও একজন নারী উচ্চশিক্ষিত হয়েও অশিক্ষিত একজন ব্যবসাহিকে বিয়ে করেছেন! জানলাম ওর বাবা-মা পছন্দ করেই বিয়ে দিয়েছে। মেয়েটা আমার সাথে ফেসবুকে বন্ধু হোল, ওর বাবা-মা আর ছোট ভাইয়ের ছবি দেখাল, বলল, আমাকে নাকি ওর বড় বোনের মত মনে হচ্ছে। এই তিন দিনেই অনেক আপন লাগছে। একটা ব্যাপার আমি শুরু থেকেই লক্ষ্য করছিলাম, কেঞ্জিং গোম্ফাতে স্কুল যাবার বয়েসি কোনো বাচ্চাই দেখিনি। এঞ্জাজিওর কাছ থেকে জানলাম, সব পরিবারের বাচ্চারাই কাঠমান্ডুতে স্কুল কলেজে পড়ালেখা করে, ছুটিতে শুধু এখানে আসে। ল্যাংটাং এ পড়ালেখার আর চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে, কিন্তু এখানে নাই। সামান্য সমস্যা হলেও ল্যাংটাং যেতে হয়।
হাঁটতে হাঁটতে ঐ জায়গায় গেলাম, যেখান ওরা অভিযানে যাবার দিন ছোট হতে হতে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ বসে থাকলাম, চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে গাঞ্ছাম্পো। আজকে ওরা ফিরে আসলে, দুপরের খাবার খেয়েই আমরা চলে যাবো। ভাবতেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল… পথে একজন ভারতীয় ভদ্রলোকের সাথে দেখ হোল, সাথে ওরার কানাডিয়ান বউ আর স্থানীয় গাইড। কিছুক্ষণ গল্প হোল ওনাদের সাথে, ওনারা কেঞ্জিং গোম্ফাতেই বেড়াতে এসেছে। আমি ওদের ছবিও তুলে দিলাম। অনেকক্ষণ পর খেয়াল করলাম, নির্জনতার একদম ভিন্ন একটা আবেগ আছে। নিজেকে উপলব্ধি করার আর নিজের সাথে কথা বলার মতো এক সুযোগ সৃষ্টি করে নির্জনতা। আশপাশে কেউ নেই, শুধু কিছুক্ষণ পর পর পাখি উড়ে এসে বুঝিয়ে দেয় যে আমি জীবন্ত পরিবেশে আছি, তানাহলে মনে হত আমি কোন ক্যানভাসের ভেতরে বসে আছি, যেখানে শুধুই আমি জীবন্ত, বাকি সব স্থির !
এর মধ্যে আমি অনেকবার তৌকির কে কল দিচ্ছি, ম্যাসেজ দিচ্ছি, কিছু যাচ্ছে না। সারে ১২ টার মতো বাজে, আমার অনেক টয়লেট যাবার প্রয়োজন হোল, আমি ধীরে ধীরে হেঁটে হোটেলে ফিরে আসলাম। চা বানিয়ে খেলাম, তেঞ্জিং খবর দিল, আমাদের ৮ জন সামিট করেছে… আমি জানতে চাইলাম ও কীভাবে জানলো? আজ সকালেই নাকি একজন কে হেলিকপ্টারে রেস্কিউ করতে হয়েছে ইয়ালা বেস ক্যাম্পের কাছে থেকে, ওরাই জানিয়েছে গতকাল ৮ জন সামিট করেছে। আমি মনে মনে ভাবছি, ফারজানা আর কে হতে পারে? সাইফ? এসব ভাবছি…আর তৌকিরের ফোন…”আপু, আমরা আর ২ ঘণ্টার মধ্যে চলে আসবো, ইনশাআল্লাহ! আমি ভাবলাম, আমি আবার গিয়ে ঐ জায়গায়ই বসে থাকি, তাহলে ওদের অনেক দূর থেকেই দেখতে পাবো।
এই ভেবে পানির বোতল ভরে রওনা দিব, এমন সময় দেখি দূর থেকে অর্ণব এর মতো কাউকে দেখা যাচ্ছে! আমি প্রথমে বুঝতেই পারলাম না যে তৌকির কিছুক্ষণ আগেই বলল সময় লাগবে…একে একে অর্ণবের সাথ নুড়ি, সাদিক, সুপ্ত সবাইকেই দেখতে পাচ্ছি…আমি এক দৌড় দিলাম। অর্ণব চিৎকার করে বলছে, মা দৌড়ায় না, ব্যাথা পাবা…কে শোনে কার কথা? প্রায় আড়াই দিন পর সবাইকে দেখছি, আর আমার মনের অবস্থা কেমন ছিল তা শুধুই আমি জানি! এই দলে তৌকির আর ফারজানা ছিল না, বুঝলাম, ও আর ফারজানা পেছনে আছে, ওদের আসতে আর একটু সময় লাগবে। প্রথম দল যে এত জলদি চলে আসবে, এটা তৌকির বুঝতে পারে নাই।
সবাই মাঠের মধ্যে শুয়ে বসে ইয়ালা পিকে সফলভাবে আরোহণ করে নেমে আসায় আনন্দ উপভোগ করছে। জানতে পারলাম, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য তৌকির ফারজানার সাথে বেস ক্যাম্পেই ছিল। আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভাবে সাইফের সামিট করে বেস ক্যাম্প পর্যন্ত ফিরে আসর ভয়ংকর রেস্কিউ এর কথা শুনলাম। বিস্তারিত পরে জানবো, শুধু এতটুকু বুঝতে পারলাম যে মাহি আর অর্ণবের মতো টেকনিক্যালি অভিজ্ঞ মানুষ থাকায় সাইফ অক্ষতভাবে ফিরে আসতে পেরেছে! নিশ্চয়ই বিস্তারিত গল্পে আরোও ভয়াবহতা লুকিয়ে আছে।
সবাই একটু ঠিকঠাক হয়ে দুপুরের খাবার খেতে বসলাম, আমি আগে থেকেই ৫ টা ডাল ভাতের কথা বলে রেখেছিলাম, বাকিরা ফ্রাইড রাইস, চাওমিন, পিজা, অমলেট, যার যার পছন্দ মতো খাবার নিল। আমরা খাওয়া শুরু করলাম, এমন সময় ডাইনিং এর জানালা দিয়ে ফারজানা আর তৌকিরকে দেখা গেল। তাহমিদ এক দৌড় দিল ওদের এগিয়ে আনার জন্য। ফারজানাকে অনেক বেশি দুর্বল দেখাচ্ছিল। একটু সময় নিয়ে ওরাও খেতে বসল। খাওয়া শেষ করে ব্যাগ গুলো আবার আগের মতো করে গোছানো হোল। এখন ডাফেল ব্যাগে ফারজানা আর তাহমিদের বেশ কিছু জিনিস যোগ হোল, আমাদের পোর্টার মিংমাকে একটু অসাবলিল লাগছিলো, মাহি বলল, ওদেরকে টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। দেখলাম, সেই কাঠমান্ডু থেকে কেনা পাটের ব্যাকপ্যাক ভরে তাহমিদ বই নিয়ে আসছে…! ধৈর্য ধৈর্য ধৈর্য…! আর আসার সময় এ ব্যাগটাই তৌকির দুইদিন ধরে বহন করেছে !

আজকে থেকেই শুরু হবে আমাদের ফিরে যাবার যাত্রা। মাহি হোটেলের বিল পরিশোধ করলো, ওকে দেখে আমার বুঝতে অসুবিধা হোল না যে বিলের পরিমাব অনেক বেশি ছিল! ১০ তারিখ সকাল (নাস্তা হাইয়ার হোটেল থেকেই করে আসছিলাম) থেকে ১২ তারিখ দুপুর পর্যন্ত বিল আসলো ২৯,৮০০ রুপী! আমি একটু খেয়াল রাখলেই এমনটা হতো না…
আমি তেঞ্জিং আর এঞ্জাজিওর সাথে ছবি তুললাম, ওরা বলল, আমি যেন এই হোটেলের ব্যাপারে পোস্ট করি। সবাই প্রস্তুত। একটু পরেই শুরু হবে হাঁটার পালা। যাত্রা শুরুর আগে ছোট্ট করে সামিটের গল্প বলল মাহি। পথ কতটা সুন্দর, কঠিন আর ঠান্ডা ছিল, আর ভাগ্যক্রমে পাওয়া একদম সাদা বরফে আচ্ছাদিত ইয়ালার পথ কতটা সুন্দর ছিল। সবাই কে কেমন ছিল, সাদিক, নুড়ি আর কামরুল সব দিক থেকেই একদম ফিট ছিল। সামিট করার পর সাইফ একদম শরীর ছেড়ে দিয়েছিল, মাহি আর অর্ণব, আগে পরে থেকে রোপ দিয়ে ওকে মাঝখানে রেখে কতটা সাহসিকতার সাথে বেস ক্যাম্প পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল। বুঝতে পারলাম, সাইফের যাওয়ার প্রতি কেন মাহি একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। পর্বত আসলেই আবেগের জায়গা না। ওকে এরকম এলোমেলো অবস্থা থেকে নামিয়ে আনার জন্য কোন আবেগ কাজে আসেনি। মাহি আর অর্ণবকেই রোপের সাহায্যে নিজেদের দক্ষতা ব্যবহার করে নিরাপদ ভাবে নামিয়ে আনতে হয়েছে। শুধুমাত্র সামিটে যাওয়া পর্যন্ত ও নিজেকে ধরে রেখেছিলো, তারপর? আমার রাগ লাগছিল ওদের উপর যারা ওকে নিয়ে যাওয়ার ব্যপারে মতামত দিয়েছিল কারন অতি উচ্চতায়, সবার নিজের সাথেই লড়াই করে এগিয়ে যেতে হয়, সেখানে অন্যের ভার বহন করে আনাটা নিতান্তই একটা বিলাসিতা। এখানে নুড়ির মতামতটাই ছিল সঠিক!
সবার মতামতের অন্তর্ভুক্তির যে উদারতা, এই বিষয়টার উপর আমার অনেক রাগ হোল, এমনিতেই একটা দল দিয়ে পাহাড়ে আসা এবং সবাইকে নিরাপদে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত দলনেতার উপর একটা অনেক বড় দায়িত্ব। এর সাথে যদি যোগ হয় এমন ঘটনা, এতে অনেক বেশী মানসিক আর শারীরিক চাপ নিতে হয় দলনেতা সহ্য দলের অন্যান্য অভিজ্ঞদের! কি পরিমাণ কষ্ট আর কি পরিমাণ বিপদ মোকাবেলা করে সাইফকে নামিয়ে আনা হয়েছে…একটু এদিক ওদিক হলেই সাইফ পরে যেত কয়েকশো ফিট নিচে! এই সম্পূর্ণ ব্যপারটা তারাই অনুধাবন করতে পারবে, যারা কাছে থেকে দেখেছে। নিজের দুর্বলতা নিয়ে কেউ কথা বলতে পছন্দ করে না, তাই সাইফ ও কোনোদিন এসব নিয়ে খোলামেলা ভাবে কথা বলবে না…এর প্রমাণ হোল, এই পর্যন্ত ও কোন লেখার মাধ্যমে বিন্দু পরিমাণ কৃতজ্ঞতাও দেখায়নি। আমাদের ভাগ্য ভালো, তাই অভিজ্ঞতা সঠিক সময়ে, সঠিক ভাবে কাজে লাগিয়ে ওকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করা হয়েছে, অথচ এর উলটো হলে এতদিনে আমরা কত শত গাল খেতাম!
আজ আমাদের গন্তব্য ল্যাংটাং গ্রাম। আমি যেহেতু এখানে ২ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রাম পেয়েছি, তাই অনেক ফুরফুরা ভাবেই যাত্রা শুরু করলাম। কিছুটা মন খারাপ লাগছে এই গ্রামটা ছেড়ে যেতে। মানুষ আসলেই আজব প্রাণী, অল্পতেই মায়ায় পরে যায়।
আমি হাঁটছি আর সাইফের ব্যাপারটা বার বার মনে হচ্ছে… সামিট করে নামার সময় সাইফ শরীর একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিল, সোজাভাবে পায়ের পাতাও ফেলতে পারছিল না, একদমই যাকে বলে এলোমেলো ঘুমন্ত প্রায় অবস্থা! ওর একার পক্ষে হেঁটে নামা ছিল অসম্ভব। এক কদমও ও স্বাভাবিক ভাবে দিতে পারছিল না, সম্পূর্ণ মানুষের ওজনটাকে মাহি আর অর্ণব রোপের সাহায্যে সামঞ্জস্য করে নিয়ে এসেছে, যার জন্য অনেক বেশি শারীরিক আর কারিগরি দক্ষতার অনেক প্রয়োজন।
পাহাড় একদমই আবেগের ভিত্তিতে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবার জায়গা না! আমাদের তরুণদের মধ্যে এরকম একটা অনুভূতি কাজ করে যে, কোন ব্যাপার না, করে ফেলবো! সমতলের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার সাথে পাহাড়ে ট্রেকিং করার সময়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অনেক পার্থক্য থাকে। দূর থেকে অনেক সাধারণ মনে হলেও, পাহাড়ে এক কদম দেওয়াও অনেক কষ্টকর হতে পারে। পাহাড়ের আবহাওয়া অথবা আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো মোটেও হেলা করার মতো না। এই ব্যাপারটা এবারের মিশন হিমালয়া দলের সবাই অনেক ভালোভাবেই টের পেয়েছে। সমতলের দুর্বল মানুষটিও পাহাড়ে সাবলীল থাকতে পারে, আর সমতলের অনেক বলিষ্ঠ মানুষও পাহাড়ে একদম দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এই ব্যাপারগুলো মেনে নেওয়ার জন্য একটা সহজ আর বড় মন থাকাটা অনেক জরুরি। তানাহলে, নিজের অজান্তেই নিজেকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আমরা ভুল কথাকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলি, যা অন্যদের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর ও ক্ষতিকর হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এখন প্রশ্ন হোল, যারা আবেগ থেকে সাইফকে নিয়ে যাওয়ার ব্যপারে জোড় দিয়েছি, তারা কেউ কি ঐ বৈরি পরিবেশে সাইফ কে কোন সহযোগিতা করতে পেরেছি? আমি চাই এই উত্তরটা নুড়ি বাদে সবাই নিজেকে দিক আর পরবর্তীতে আবেগী হওয়া থেকে বিরত থাকুক।

ল্যাংটাং এর এই রাস্তার পাশ দিয়ে যাবার সময় মনে পরল, যেদিন আমরা ল্যাংটাং থেকে কেঞ্জিং গোম্ফা যাচ্ছিলাম, স্থানীয় একজন জানতে ছেয়েছিল, আমরা কোনদেশী? বাংলাদেশ শুনেই বলল, তোমাদের মেয়েরা অনেক ভালো ফুটবল খেলে! শুনেই অনেক গর্ব হয়েছিল! আমরা টুক টুক করে ল্যাংটাং গ্রামে পৌঁছে গেলাম, আমাদের দল যাবার সময় যে হোটেলে ছিল, বেশী মানুষ হওয়ায়, সেই হোটেলে আমরা রুম পাইনি, তার পাশেই একটা হোটেলে আমারা উঠলাম। আমি আসতে আসতে, বাকিরা, এসে, রুমে ব্যগ রেখে জুতা খুলে আয়েস করে বাহিরে বসে আছে। পাশের ক্যাফেতেই আমাদের মিশন হিমালয়া ২০১৮ এর স্টিকার দেখতে পেলাম। এই হোটেলে রুমটা আমার অনেক পছন্দ হল। রুমটা কিছুটা তিনকোনা ধরনের দুইপাশের ওয়ালে ২ টা ছোট বেড রাখা তার ওয়াশরুমটাও সুন্দর। কল ছাড়তে গরম পানি বের হয়ে আসলো খুব ভাল করে হাত মুখ ধুলাম জুতা খুলে পা ধুয়ে নিলাম। এর পর আজকের মতো শেষ গন্তব্য, ডাইনিং হল। আড্ডা আর অনেক গল্প হল। মজা হল, হাসাহাসি হল। ঘুমের সময় হয়ে এল, আগামীকাল আমাদের গন্তব্য হবে ব্যাম্বু।
একটু একটু করে পাহাড়ি পথের মায়া ত্যাগ করে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। এই আঁকাবাঁকা পথের কোথাও কোথাও, কিছু আবেগ, কিছু না পাওয়া, কিছু শরীর ভেঙ্গে আসা মুহূর্ত, কিছু আনন্দ, কিছু বিরক্তি, কিছু মেজাজ খারাপের সময়, কিছু অর্জনের গল্প, এই সব ছেড়ে আমরা শহরের কোলাহলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এই মুহূর্তগুলোই ভবিষ্যতে কোনো দিন ভাবনার খোরাক হয়ে, আমাদের মনের অজান্তেই ঠোটের কোনায় মৃদু হাসির যোগান দেবে…

Leave A Comment