ইয়ালা ডায়েরী – পর্ব ৫

১০ নভেম্বর ২০২৪ – দিন ৮

আজ ঘুম থেকে উঠলাম ৬ টায়। যথাসম্ভব মাহিকে ব্যাগ গোছাতে হাত লাগালাম। খুব অবাক লাগে, পাহাড়ে এত ঠাণ্ডায়ও সকালে একবার বিছানা থেকে উঠে গেল আর আলসেমি লাগে না। যদি ঠিকমত ঘুম হয়, তাহলে কোনও সমস্যাই হয় না। অনেকের ক্ষেত্রেই বিছানা বদল হলে ঘুম আসে না, কিন্তু পাহাড়ে সারাদিন ট্রেকিং করার পর, মন ফুরফুরা থাকলেও শরীর ক্লান্ত থাকে তাই ঘুমাতে সমস্যা হয় না। আর মস্তিস্কে সবসময় পরের দিনের যাত্রার একটা অস্থিরতা কাজ করতে থাকে।

আমাদের পাশের রুমেই ছিল নুড়ি আর ফারজানা, মনে হোল আজকে ফারজানার উঠতেই একটু কষ্ট হোল। সবাই ডাইনিং এ, সকালে অপেক্ষাকৃত কম হৈ হুল্লোড় হয় কারণ সবই তখনো কিছুটা ঘুমের ঘোরেই থাকে। বরাবরের মতই যার যার পছন্দ অনুযায়ী নাস্তা হোল। সব গুছিয়ে বেড় হবার সময় সবাইকে বলে দেওয়া হোল, আমি আর তাহমিদও ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। বেড় হলাম বাইরে। আমাদের হোটেল হাইয়ারের বের হবার দরজাটা স্লাইডিং, ব্যাগ সহ বের হতে কষ্ট হয়। কেউ কেউ ব্যাগ সহ অনেক কসরত করে বের হোল, আর কেউ কেউ ব্যাগ হাতে নিয়ে বের হোল। ডাফেল ব্যাগগুলো লম্বা করে বের করতে হোল।

মাহি আর তৌকির আমাদের জন্য আরেকটি হোটেল ঠিক করে রেখেছিল রাতেই, হোটেল ইয়ালা পিক! সবাই যাবে বেস ক্যাম্প হয়ে ইয়ালা পিক আর আমরা অল্প হেঁটেই যাবো হোটেল ইয়ালা পিকে। আমাদের ব্যাগ আর অভিযানের সবার একটা করে ব্যাগ আর একটা ডাফেল ব্যাগ, এইসবগুলো ইয়ালা পিক হোটেলের স্টোর রুমে রাখা হোল, কারণ আমরা যে রুমগুলাতে উঠবো, সেগুলো তখনো খালি হয়নি। সব ব্যাগ রেখে আমরা অভিযাত্রী দলকে বিদায় দেবার জন্য গেলাম। নামাস্তে হোটেলের সামনে একটা খোলা যায়গা আছে, সেখানে আমরা ছবি তুললাম, সবাইকে শুভকামনা জানালাম। শেষ মুহুর্তের ব্রিফিং করা হোল। প্রথমে থাকবে মাহি, মাঝের দিকে অর্ণব. আর শেষে থাকবে তৌকির। এবার বিদায়ের পালা। কেমন যেন একটা শূন্যতা কাজ করছে… যতদূর পর্যন্ত ওদের ছোট্ট নড়াচড়া দেখা যাচ্ছিল, দাঁড়িয়ে থাকলাম, ওরা সবাই ধিরে ধিরে একদম ছোট্ট হতে হতে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ওদের বিদায় দিয়ে বেশ কিছুক্ষন আমি ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম…হঠাত মনে হল, তাহমিদের সাথে দুইদিন থাকাটা সহজ কাজ হবে না, অনেক ধৈর্য রাখতে হবে আর বুঝে শুনে কথা বলতে হবে, যদিও ওর সাথে থাকা অন্যকেউ কথা বলার সুযোগই পায় না…! কিছুক্ষণ ছবি ভিডিও নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম, ভাল লাগছে না। তাহমিদের সাথে গল্প করে মজা নেই কারণ ও শুনে কম, শুধুই বলার তাগিদে থাকে, যেন সময় ধরা আছে যে এই সময়ের মধ্যে এতগুলো শব্দ বলতেই হবে! যহেতু, তাহমিদের সাথে আমার বয়েসের পার্থক্য এক যুগেরও অনেক বেশী, তাই হয়তো আমি ওদের ট্রেন্ড ধরতে পারি না।

হোটেল ইয়ালা পিক, আমার অনেক পছন্দ হোল, সামনে বড় একটা মাঠের মতো খোলা যায়গা, আমাদের হাইয়ার হোটেল ছাড়ার বড় কারণই ছিল চারতলা একটা বিল্ডিং, দমবন্ধ লাগে। ইয়ালা হোটেলে একটা দুইতলা বিল্ডিং আছে আর মাঠের সাথেই কটেজের মতো ৪ টা রুম আছে, বড় আকর্ষণ, নিচে সবগুলো ঘরে লাগোয়া বাথরুম আছে। পাশেই একটা ছোট্ট দোকান আছে, যেখানে, সাবান, টিস্যু, টুপি, মোজা, আর কিছু সুভেনিয়ার ও জুয়েলারিও পাওয়া যায়। এই ছোট্ট ছোট্ট জিনিসগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে। যেহেতু অতি উচ্চতায় দোকান, তাই সবকিছুর দামই অনেক বেশী। আমি সেই দোকান থেকে একটা টয়লেট পেপার নিলাম, ঢাকা থেকে যে টিস্যু নিয়ে এসেছিলাম সেটা শেষ হয়ে গেছে। দাম দিতে চাইলাম, পাশে থাকা মেয়েটা বলল, পরে একসাথে বিল দিলেই হবে। সবার সব রেখে যাওয়া ব্যাগ আর অনেকগুলো স্যান্ডেল আমার ঘরে রাখা হোল, গুছিয়ে রেখে দেখলাম, একটা রঙের সমারোহ মনে হচ্ছে, জানিনা কেনো যেন ব্যাগগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম আর অনেক আগের এক অভ্যাসে ফিরে গেলাম, মাথায় ছন্দের মত কিছু লাইন আসছে…! লেখালিখি আমার বরাবরই ভাল লাগে, তবে ২০১৫ সালের কিছু সময় আমি অনেক কবিতা লিখেছিলাম। এখন কোনভাবেই কবিতার কোন ছিটে-ফোঁটাও মাথায় আসে না। এই মুহূর্তে যা মনে আসলো তা আসলে কিছুটা ছড়ার মত…

চুড়ান্ত গন্তব্যের পথে
থেকে যায় কিছু উচ্ছিষ্ট,
জীবনে চলার পথে
থেকে যায় কিছু স্মৃতিচিহ্ন,
সিদ্ধান্তের টানাপোড়েনে
ছুটে যায় কিছু সঙ্গ!

সকাল সারে নয়টার মত বাজে, ঝাল কিছু খেতে ইচ্ছা করছে, কি খাওয়া যায়? রান্নাঘরে গেলাম। তেঞ্জিং কে বললাম, ঝাল কিছু খতে চাই, ও একটু মোটা ধরনের নুডুলস দিয়ে কিছু একটা বানিয়ে দিতে চাইল, শুনে ভাল লাগলো। আহমিদ, খেতে পারবে কিনা নিশ্চিত না হয়েই, আমার দেখাদেখি একই জিনিস চাইল একটু কম ঝাল দিয়ে। যা বানিয়ে দিল, তা স্যুপ নুডলস ও না, আবার ফ্রাইড নুডলসও না, মাঝামাঝি কিছু একটা, তবে চটপটির মতই মজা লাগলো, এখন লিখার সময়ও জিভে পানি চলে আসছে! মজা করে খেলাম, দেখলাম তাহমিদ একদম খেতে পারছে না, আমার খাওয়া শেষ হতে হতে ওর ১০ ভাগও খাওয়া হয়নি! বুঝলাম ওর এখনো উচ্চতা জনিত সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু যথারীতি ও বুঝতে দিচ্ছে না, কিন্তু বাচ্চাদের মতো যুক্তি দিতে ভুল করলো না যে ঝাল কম হয়েছে বলে খেতে পারছে না…আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, পাশেই রান্নাঘর, একটু মরিচ অথবা সস নিয়ে আসলেই পারতা…! আমি রান্নাঘরে বাটি রেখে এসে, বেঞ্চে বসলাম। আশপাশে ৭ / ৮ টা খচ্চর আর ইয়াক চলাফেরা করছে, ঘাস খাচ্ছে, আওয়াজ করছে, ওরা অনেক সময় ধরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আবহাওয়া কিছুটা রৌদ্রুজ্জল থাকাতে আমি ছোট ছোট কিছু কাপড় ধুয়ে দিলাম, তাতেই জমে যাবার যোগাড় হচ্ছে, মনে পরল, নুড়ি, ইমন আর সাদিক ওকদের প্যান্ট সহ বেশ কিছু কাপড় কলের ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে দিয়েছিল…সবার সাহস আছে, এই সাহসিকতার শুরু করেছিল অর্ণব! যেহেতু ওর অনেক লম্বা সফর ছিল, ওজনের কথা চিন্তা করে কাপড় ধুয়েই চালাতে হয়েছিল ওকে। আমি দেখেই জমে যাচ্ছিলাম। তবে, আমিও সাহস দেখালাম, গলা পর্যন্ত ভিজিয়ে গোসল করে ফেললাম, অবশ্যই গরম পানি দিয়ে! দুপুরে খাবারের সময় হয়ে গেল, পেট এখনও ভরা লাগছে কারন সেই চটপটির মত নুডুলসের পরিমাণ অনেক বেশীই বেশী ছিল।

আমি যে ট্রেকিং প্যান্টটা পরে আসছিলাম, সেটার পকেটের কাপড়টা একটু ছিঁড়ে গেছে, ভাবলাম, এখানে যেহেতু আর কোনই কাজ নেই, সেলাই করা যায়। বাহিরে যে বেঞ্চটা আছে সেখানে বসে সেলাই করতে শুরু করলাম। এটা আমার অনেক প্রিয়, কারণ প্রথম ট্রেকিং প্যান্ট, কানামো অভিযানের সময় কিনেছিলাম ২০১৮ সালের জুলাই মাসে। তখন আমার ট্রেকিং এর কিছু ছিল না, মাথার টুপি থেকে শুরু করে বুট পর্যন্ত সব কিনেছিলাম ডিক্যাথলনের কালীতলা আউটলেট থেকে। বিকেল বেলা দোকানে ঢুকেছিলাম আর বের হয়েছিলাম শাটার বন্ধের সময়! সেই কি মজার স্মৃতি…আমার ২০১৮ সালের অভিযানটা ছিল জীবনের দ্বিতীয় দফার ভ্রমণ শুরুর পালা…বিরাট অংকের লোণ পরিশোধ করে মুক্ত পাখির মতো হয়ে, ৪ বছর পর দেশের বাহিরে গিয়েছিলাম…তাই কানামো অভিযান আমার অনেক স্মৃতিময়!

অভিযানের সবার কথা মনে হচ্ছে বারবার, কেমন হচ্ছে ট্রেকিং? বেস ক্যাম্প পৌছালো কিনা? রাস্তা কেমন কঠিন, কেমন ঠাণ্ডা? এইসব চিন্তা ঘিরে রেখেছে আমাকে। সাইফের ব্যপারটা মাথায় চাপ দিচ্ছে, ছেলেটা নিজের একটা মেডিক্যাল কন্ডিশন উপেক্ষা করে এখানে এসেছে, ও হয়ত বুঝতেই পারেনি, এই উচ্চতায় কি পরিমাণ বিপদ হতে পারতো! ও আসলেই এখনো ছোট্ট একটা বাচ্চা! আমার মাহির উপর পূর্ণ আস্থা আছে, সাথে তৌকিরের মত সুপার ম্যান আছে আর অর্ণব, সাদিক সহ দলে অনেক শান্ত সদস্য আছে যারা যেকোন ব্যবস্থাপনাই সহজে করতে পারবে। সকালের দিকে হয়তো ট্রেকিং খানিকটা সহজ ছিল, বেস ক্যাম্পের কাছাকাছি অবশ্যই কঠিন ট্রেক হবে। আজকে ওরা ৩৮৭০ মিটার থেকে রওনা করেছিল, বেসক্যাম্প কমবেশি ৪৮০০ মিটার, অর্থাৎ ওরা আজ কমবেশি ৯৩০ মিটার বেশি উচ্চতায় পৌঁছাবে। এখন বেলা তিনটা বাজে, যদি সব ঠিক থাকে, ওরা এতক্ষনে বেস ক্যাম্প পৌঁছে যাওয়ার কথা। আমার এখানে মেঘ দেখে মনে হচ্ছে, ওদের ওখানটা মেঘের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। ফোন করার ব্যবস্থা নাই, খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা নাই, একদম আশির দশক অথবা তারও আগের সময়ে আছি। সেই সময়গুলো অনেক আকর্ষণীয় ছিল, সবকিছুর জন্যই মানুষ অনেক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতো…চিঠি আসতো…কেউ কারো বাসায় হঠাত করে আসতো…মেহমান দেখেই মুরগী জবাই দেওয়া হতো। অনেক বেশি আতিথিয়েতা ছিল, এখন সবাই সবাইকে ফেসবুকে দেখে, তাই বাসায় আসা যাওয়া অনেক বেশি পরিমাণে কমে গেছে। বাচ্চারা আত্মীয়স্বজনদের চেনে না…! 

সামনে গাঞ্ছাম্পো, পাশেই কতগুলো ইয়াক, যারা রান্নাঘরে অথবা বাহিরে কাজ করছে, তাদের অপরিচিত শব্দের আওয়াজ, কারো হাসির শব্দ, থালাবাটির শব্দ, পানির শব্দ, আমি মাঝে বেঞ্চে বসে এক পা চেয়ারে তুলে দিয়ে সেলাই করছি… সব মিলে এক মায়াবী পরিবেশ, শুধু খাপছাড়া লাগছিল সামনেই বসা তাহমিদকে, সে বিশাল শব্দে হেডফোনে একদম পাগলা সুরের গান শুনছে, যা আমি ৩ ফিটের মত দূরে বসেও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম আর সবচেয়ে মজার দৃশ্য হোল, গানের সুরের মত ও মাথা আর শরীর দুলাচ্ছে, মনে হোল যেন গান আর ওর শরীর বাজি ধরেছে যে কে কতো পাগলা হতে পারে…! এই দৃশ্য আমার দুইদিন ধরেই দেখতে হয়েছে! বসে, দাঁড়িয়ে, অথাবা পায়চারী করতে করতে, ডাইনিং এ খেতে খেতে এই সুরের সাথে ওর শরীর দুলানোর বাজি চলমান ছিল…জানিনা কে জিতলো সেই পাগলা বাজিতে…! আশেপাশে স্থানীয় সবার মধ্যে কেমন যেন একটা উৎসব আমেজ মনে হোল, সবাইকে মনে হচ্ছে নতুন জামা পরা আর কেউ কেউ বাসার সামনের অংশ রঙ করছে। বুঝতে পারলাম না ঠিক কি হচ্ছে। একটু পর পর আমার ধুয়ে দেওয়া কাপড়গুলো উল্টে দিচ্ছি যেন তারাতারি শুকিয়ে যায়। 

যেহেতু পেট ভরা ভরা লাগছে, তাই আমি দুপুরে শুধু আলু নিলাম, সেটাও অনেক বড় প্লেট ভরে আসলো। তাহমিদ নিল পিজার মত কিছু একটা যা দেখতে প্লেট ভর্তি এক বড় ক্রোসেনের মতো মনে হোল। আমি কিছুটা খেয়ে বুঝতে পারলাম আর বাকিটা আমি শেষ করতে পারব না। তাই আমি তাহমিদকে বললাম ও যেন আমার কাছ থকে কিছু আলু খেয়ে নেয়। আমি ভেবেছিলাম যে ও খাওয়ার পর আমি বাকিটা খাবো। কিন্তু ও বাচ্চাদের মত এমন ভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করল যে সেটা দেখে আর খেতে ইচ্ছে হোল না। আজ সকাল থেকেই তাহমিদ যে খাবার পানি খেয়েছে, তা বারবারই আমার পানির বোতল থেকে। ওর রুমে পানির বোতলটা রেখে আসছে এবং প্রতিবার আমি ওকে মনে করিয়ে দিচ্ছি…বাকিটা ইতিহাস। কিন্তু ও একবারও পানির বোতল সাথে করে নিয়ে বের হচ্ছে না। যেহেতু আমার পানির বোতলটা ৭০০ এমএল। পানি শেষ হয়ে গেলে বারবার আমাকে গরম পানি মিশিয়ে আবার বোতল ভরে রাখতে হচ্ছে। সেখান থেকেও যদি কেউ অর্ধেক পানি খেয়ে ফেলে, আমাকে এই পানি নিয়েই ছুটাছুটি করতে হচ্ছে। খাওয়ার পর আমি একটু হাঁটতে বের হলাম। আশপাশটা একটু ঘুরে দেখলাম।

অনেকবার পড়েছি, একা ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা, কিছুটা সেরকমই অনুভব করলাম…। ভাবলাম, আগামিবছর আমি অন্ততপক্ষে, ৫ বার ভ্রমণ করবো। ১-২ বার অফিস থেকেই হবে, একবার অর্ণবের সাথে আর আরেকবার মাহি -অর্ণবের সাথে, আর অবশ্যই একবার আমার সবচাইতে কাছের ভ্রমণ সঙ্গী অরুণিমার সাথে। দলের সাথে থাকলে হয়তো শুধুমাত্র নিজের কথা ভাবতে পারতাম না, যা এখন পারলাম! আর, এই পর্যন্ত আসতে শরীরের যে অবস্থা বুঝলাম…দেশে ফিরেই ফিটনেস নিইয়ে কাজ শুরু করতে হবে। এই বছর মোট ১১ বার ভ্রমণ করেছি, এর মধ্যে ব্যক্তিগত, অফিস আর ২ বার হাসপাতালেও যেতে হয়েছে , হাসপাতালে ক্যানোলা আর টেস্ট বাদে বাকি সময়টা ভ্রমণের মতই মনে হয়, বিশেষ করে এভারকেয়ারের খাওয়া আমার অনেক ভাল লাগে। অর্ণব একবার মজা করে বলেছিল, তোমার সেন্স ছিল না কিন্তু হাসপাতাল কিন্তু তুমি প্লেট ভরে ভরে ভাত খেতে পারতা…! এটা ২০২১ এর অক্টোবরের কথা, আমার হ্যামোরিজিক ডেঙ্গু হয়েছিল…প্ল্যাটিলেট ৮ হাজার…তিনজন আমাকে প্লাটিলেট দিয়েছিল, ওদের প্রতি আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো! 

বিকালে হট চলকেট খেতে মন চাইল, কারণ গতকাল যখন সবাই ক্লাইম্বিং করে ফিরছিল, আমি সেই ফাঁকে দর্জি ক্যাফেতে আবার গিয়েছিলাম, হট চকলেট আর একটা অ্যাপলে পাই খেয়েছিলাম। ওরা হট চকলেটের উপর আইসক্রিমের মত করে ফোম করে দিয়েছিল, দেখতেই ভাল লাগছিলো। মজার খাওয়া শেষ করে হেঁটে যেতে যেতে আমি হোটেলের রাস্তাও ভুল করে ফেলেছিলাম! বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে কয়েকবার কয়েক জনকে জিজ্ঞাসা করে গোলাপি রং ধরে ধরে এগিয়ে হোটেলে ফিরেছিলাম। তাহমিদকে জিজ্ঞেসা করলাম হট চকলেট খাবে কিনা? ও বলল, আপনি খাওয়ালে খাবো। আমি বললাম যেহেতু আমি তোমার বড় আপু, আমি তোমাকে একটা হট চকলেট খাওয়াতেই পারি, আমার এই কথার ভার Rope4 কে বহন করতে হয়েছে! আমার এই কথাকে বেস ধরে তাহমিদ প্রতি বেলায় তিনটা করে আইটেম অর্ডার করেছে! বোঝা যাচ্ছিল যে ওর কেঞ্জিং গোম্ফাতে অভিযোজন হয়ে গেছে…খাওয়ার আর কোন সমস্যা হচ্ছিল না। 

সন্ধ্যা হয়ে এলো, আমরা ডাইনিং এ। বার বার মনে হচ্ছে ওরা সবাই কি করছে? বেস ক্যাম্প টা কেমন হোল? সবার কি অবস্থা? ওরা ফিরে আসা পর্যন্ত কোন নেটওয়ার্ক পাবো না। আমার নামাস্তে সিম এতই ভাল নেট দিচ্ছে যে, আমি গডফাদার মুভির প্রথম পর্বটা আরেকবার দেখলাম। কিছু কিছু পছন্দের মুভি আছে যা আমি সুযোগ পেলে বার বার দেখি, এর মধ্যে আরমাগেডন, পারসুয়েট অফ হ্যাপিনেস, টুয়াইলাইট সিরিজ আমার অনেক পছন্দের। রাত হয়ে গেল। শুধু রসুনের সুপ নিলাম। তাহমিদ দুইটা ডিমের অমলেট নিল। আমি সঙ্গত কারণে ২ টা টেবিল পরে যেয়ে কোনায় বসলাম…! খাওয়া শেষ, আর কোনই কাজ নেই, তাহমিদকে বললাম, যেন সকালে আমার জন্য অপেক্ষা না করে, নাস্তা করে নেয়। ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ছোট্ট একটা ঘর, একটা ছোট টেবিল, আর আধো আধো জ্বলা বাতি আর বড় একটা টয়লেট। আমি সকালে এসেই ওয়েট পেপার দিয়ে যথাসম্ভব পরিষ্কার করে নিয়েছিলাম। যদিও তেমন কোন ময়লা ছিল না, কিন্তু আমার অল্প পরিসরে শুচিবায়ু আছে! এখানকার সব হোটেলের ঘরের চাবির রিং গুলো খুব আকর্ষণীয়, পাখি অথবা অন্যান্য প্রাণীর নকশায় করা থাকে। বিছানার উপর রাখা সব ব্যাগ পাশের বিছানায় স্থানান্তর করলাম, কারণ পাশের বিছানাটা জানলার পাসে, ওটাতে ঘুমালে অনেক ঠাণ্ডা লাগতে পারে। তাহমিদ পাসের ঘরে। ঘুমানোর আগের সব কাজ সেরে, একদম প্যাকেট হয়ে ঘুমাতে গেলাম। এখানেই শেষ নয়…পাসের ঘর থেকে ধুপধাপ শব্দ পাচ্ছি…ভয় পাওয়ার কিছু নাই, তাহমিদ ঘরে হাঁটছে, আর যদি আমার ভুল না হয়, গান শুনছে আরকি…! 

চলবে…

ইয়ালা ডায়েরী – পর্ব ৪

ইয়ালা ডায়েরী – পর্ব ৩

ইয়ালা ডায়েরী – পর্ব ২

ইয়ালা ডায়েরী – পর্ব ১